ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোয় সরকারি ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু সমানতালে বাড়ছে না রাজস্ব সংগ্রহ। এতে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় দেশগুলো নতুন ঋণচক্রে পড়তে পারে বলে এমন আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জার্মানিতে প্রণোদনা প্যাকেজ, ফ্রান্সের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি মিলে ইউরোজোনে সামষ্টিক ঋণ ভারী হচ্ছে। কিছু দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরলেও বন্ডের ইল্ড সামান্য বাড়লেই বাজেট চাপ তীব্র হতে পারে। সব মিলিয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপের অর্থনীতি। সামান্য ভুল নীতি পুরো অঞ্চলে ঋণের দুষ্টচক্র জেঁকে বসতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। খবর ইউরোনিউজ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউরোজোনের অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ছিল। এখন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এখানকার আর্থিক নীতি (ফিসকল পলিসি) আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ফিসকল মনিটর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোজোনের বাজেট ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বেড়ে চলেছে।
চলতি বছর ইউরোজোনের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতির আকার হবে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। সেখান থেকে আগামী বছর বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩ দশমিক ৪-এ। ২০২৭ ও ২০৩০ সালে যথাক্রমে এ ঘাটতি ৩ দশমিক ৬ ও ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত মাস্ট্রিখট চুক্তিকে ধরা হয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইউরোজোনে আর্থিক মানদণ্ড, যেখানে বাজেট ঘাটতির সীমা ৩ শতাংশ নির্ধারণ হয়েছে। কিন্তু কভিডমহামারীর পরই অঞ্চলটিতে সে নিয়ম ভাঙা যেন নতুন মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। আইএমএফ বলছে, ইউরোজোনের বাজেট ঘাটতিতে ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বিষয়।
ইউরোজোনের মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত গত কয়েক বছর তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সামনে তা বাড়ার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। পূর্বাভাস অনুসারে চলতি বছরের ৮৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০৩০ সালে ৯২ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ানোয় এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম। চলতি বছর ফ্রান্সের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৬ দশমিক ৫, যা ২০৩০ সালে দাঁড়াবে ১২৯ দশমিক ৪ শতাংশে। বেলজিয়ামে চলতি বছরের ১০৭ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে হবে ১২২ দশমিক ৬ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে পরিচিত জার্মানির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৬৪ দশমিক ৪ থেকে বেড়ে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ হবে, অর্থাৎ ৯ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি বাড়বে।
তবে ইউরোজোনের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোর অন্যতম ইতালি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। চলতি বছর ১৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২০৩০ সাল নাগাদ ১৩৭ শতাংশ হবে।
স্পেন ও পর্তুগালে সমগ্র অঞ্চলের গড় ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর কারণ দেশ দুটির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও বাজেট বণ্টনে সংযম। চলতি বছর স্পেনের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ দশমিক ৪, ২০৩০ সাল নাগাদ কমে দাঁড়াবে ৯২ দশমিক ৬ শতাংশে। অন্যদিকে পর্তুগালের ক্ষেত্রে ৯০ দশমিক ৯ থেকে কমে হবে ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রিসে ঋণ-জিডিপির অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমে ১৪৬ দশমিক ৭ থেকে ১৩০ দশমিক ২ শতাংশ হবে। তবে ইউরোজোনের মধ্যে আর্থিকভাবে সবচেয়ে স্থিতিশীল দেশ থাকবে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে এ অনুপাত কমে হবে ৩৩ থেকে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ। নেদারল্যান্ডসে ৪৪ থেকে সামান্য বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬ সাল হবে ইউরোজোনের বাজেট প্রণয়নে মোড় ঘোরানোর একটি বছর। এ পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হবে জার্মানির নতুন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও ফ্রান্সের চলমান বাজেট উত্তেজনা। বৃহৎ আর্থিক প্যাকেজ কার্যকর হওয়ায় জার্মানির বাজেট ঘাটতি জিডিপির ২ দশমিক ৯ থেকে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছবে। রাজনৈতিক বিভাজন ফ্রান্সে বাজেট ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে বাধা দিচ্ছে। দেশটির ঘাটতি সামান্য কমে ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হবে।
ঋণমান সংস্থা ক্রল বন্ড রেটিং এজেন্সি (কেবিআরএ) বলছে, ইউরোপে সরকারি ব্যয়ে বাড়তি চাপ যোগ করেছে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি, জলবায়ুবান্ধব খরচ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যেই এ ব্যয় বৃদ্ধিজনিত বাজেট ঘাটতি দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কেবিআরএর মতে, সরকারগুলো ফের বেশি ব্যয় করছে। কিন্তু বাজার এখন আর আগের মতো সহনশীল নয়। সরকারি নীতির প্রতিবাদে ট্রেডাররা এখন দ্রুত বন্ড বিক্রি করে দেন।
প্রতিবেদন অনুসারে ইউরোজোনের মোট সরকারি ঋণের ৪০-৪৫ শতাংশ তিন বছরের মধ্যে পুনঃঅর্থায়ন করতে হবে। এর প্রভাবে দ্রুতই সুদ ব্যয় বাড়বে। কেবিআরএর হিসাব অনুযায়ী, গড় ইউরোজোন দেশের ঋণ যদি জিডিপির ৯০ শতাংশের কাছাকাছি হয়, তাহলে সুদহার ১০০ বেসিস পয়েন্ট বাড়লে তিন বছরের মধ্যে বার্ষিক সুদ ব্যয় জিডিপির দশমিক ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। অর্থাৎ জার্মানি ও ইতালির বাজেটে বছরে যথাক্রমে ২০ বিলিয়ন ও ১০ বিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত চাপ যোগ হবে।